সিলেট

হাকালুকি হাওর

মিঠা পানির জলাভূমি 'হাকালুকি হাওর'

হাকালুকি হাওর  বাংলাদেশের বৃহত্তর হাওর। এটি মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলায় অবস্থিত। এর ভৌগোলিক অবস্থান ২৪°৩৫´-২৪°৪৪´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯২°০১´-৯২°০৯´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ।

হাকালুকি হাওরের নামকরণ নিয়ে নানা জনশ্রুতি রয়েছে। কথিত আছে, বহু বছর পূর্বে ত্রিপুরার মহারাজা ওমর মানিক্যের সেনাবাহিনীর ভয়ে বড়লেখার কুকি দলপতি হাঙ্গর সিং জঙ্গলপূর্ণ ও কর্দমাক্ত এক বিস্তীর্ণ এলাকায় ‘লুকি দেয়’ অর্থাৎ লুকিয়ে থাকে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে কালক্রমে ওই এলাকার নাম হয় ‘হাঙ্গর লুকি বা হাকালুকি’। এও বলা হয় যে, প্রায় দুই হাজার বছর আগে প্রচন্ড এক ভূমিকম্পে ‘আকা’ নামে এক নৃপতি ও তাঁর রাজত্ব মাটির নিচে তলিয়ে যায়। কালক্রমে এই তলিয়ে যাওয়া নিম্নভূমির নাম হয় ‘আকালুকি বা হাকালুকি’। আরও শোনা যায় যে, এক সময় বড়লেখা উপজেলার পশ্চিমাংশে হেংকেল নামে একটি উপজাতি বাস করত। হেংকেলদের বসবাস এলাকার নাম ছিল ‘হেংকেলুকি’। পরবর্তীতে এই হেংকেলুকিই ‘হাকালুকি’ নাম ধারন করে। অন্য একটি জনশ্রুতি মতে, এক সময় হাকালুকি হাওরের কাছাকাছি বসবাসরত কুকি ও নাগা উপজাতি তাদের ভাষায় এই হাওরের নামকরণ করে ‘হাকালুকি’। হাকালুকি অর্থ লুকানো সম্পদ।

হাকালুকি হাওরের আয়তন ১৮১.১৫ বর্গ কিমি। হাওরটি ৫টি উপজেলা ও ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে বিস্তৃত। হাওরের ৪০% বড়লেখা, ৩০% কুলাউড়া, ১৫% ফেঞ্চুগঞ্জ, ১০% গোলাপগঞ্জ এবং ৫% বিয়ানীবাজার উপজেলার অন্তর্গত।

হাকালুকি হাওরের বিশাল জলরাশির মূল প্রবাহ হলো জুরী এবং পানাই নদী। এই জলরাশি হাওরের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত কুশিয়ারা নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়। বর্ষাকালে হাওর সংলগ্ন এলাকা প­াবিত হয়ে বিশাল রূপ ধারন করে। এই সময় পানির গভীরতা হয় ২-৬ মিটার।

হাকালুকি হাওর

হাকালুকি হাওরে প্রায় ২৩৮টি বিল রয়েছে। প্রায় সারাবছরই বিলগুলিতে পানি থাকে। উলে­খযোগ্য বিলসমূহ হলো: চাতলা বিল, চৌকিয়া বিল, ডুল­া বিল, পিংলার কোণা বিল, ফুটি বিল, তুরাল বিল, তেকুনি বিল, পাওল বিল, জুয়ালা বিল, কাইয়ারকোণা বিল, বালিজুড়ি বিল, কুকুরডুবি বিল, কাটুয়া বিল, বিরাই বিল, রাহিয়া বিল, চিনাউরা বিল, দুধাল বিল, মায়াজুরি বিল, বারজালা বিল, পারজালা বিল, মুছনা বিল, লাম্বা বিল, দিয়া বিল, ইত্যাদি।

বর্ষাকালে হাওর এলাকায় পলিমাটি পড়ায় বিলগুলি ক্রমশ ছোট হয়ে যাচ্ছে। বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর সেখানে কিছু কিছু জায়গায় ধান চাষ করা হয়। ফসল কাটার পর বিলগুলিতে হাজার হাজার গবাদি পশু বিচরণ করে। এই বিচরণ ভূমির কারণে বহুকাল আগে থেকেই হাওর এলাকায় গড়ে ওঠে  বাথান পদ্ধতি। বছরের কয়েক মাস বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে হাওর এলাকায় বসবাসরত এক শ্রেণীর লোক অন্যের গরু-মহিষের তত্ত্বাবধান করে। বিনিময়ে প্রাপ্ত দুধ বিক্রি করে তারা জীবিকা নির্বাহ করে। নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে গরু-মহিষ মালিকের নিকট ফেরত পাঠায়। ঐতিহ্যগতভাবে হাকালুকি অঞ্চল দুধ ও দধির জন্য বিখ্যাত।

হাকালুকি হাওরে প্রচুর পরিমাণ মৎস্য সম্পদ রয়েছে। হাওরের বিলগুলি অনেক প্রজাতির দেশীয় মাছের প্রাকৃতিক আবাস। মৎস্যবিজ্ঞানীদের মতে, এই হাওর হলো মাদার ফিশারী। এখানে বিভিন্ন বিরল প্রজাতির মাছ রয়েছে। হাওর এলাকায় প্রধানত পেশাদার জেলে, মৌসুমি জেলে ও খোরাকি জেলেদের বসবাস রয়েছে।

হাকালুকি হাওরের বিলগুলিতে বিভিন্ন জাতের বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। তবে এক সময়ের অন্যতম আকর্ষণীয় Swamp Forest অর্থাৎ জলময় নিম্নভূমির বনাঞ্চল এখন আর তেমন নেই।

জীববিজ্ঞানীদের মতে, হাকালুকি হাওরে ১৫০ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ, ১২০ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ, ২০ প্রজাতির সরীসৃপ বিলুপ্ত প্রায়। এখানে প্রতি বছর শীতকালে প্রায় ২০০ বিরল প্রজাতির অতিথি পাখির সমাগম ঘটে। হাকালুকি হাওর টেকসই উন্নয়ন, জীববৈচিত্র সংরক্ষণ, ইকোটুরিজ্যম শিল্প বিকাশের এক অসাধারণ আধার।

কিভাবে যাওয়া যায়:

সিলেট বাসস্টেশন হতে বাস/মাইক্রোবাস/প্রাইভেট কার/অটোরিক্সায় করে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা সদর যাওয়া যায়। সময় ৪০মিনিট থেকে ১ ঘন্টা লাগবে। বাস ভাড়া ২০টাকা/অটোরিক্সায় ৩৫টাকা লাগবে। ফেঞ্চুগঞ্জ সদর থেকে অটোরিক্সায় করে ঘিলাছড়া জিরোপয়েন্ট যাওয়া যাবে। সদর থেকে দূরত্ব প্রায় ৬ কিলোমিটার। সিলেট থেকে সরাসরি মাইক্রোবাস/প্রাইভেট কার ভাড়া মূলত সময়ের উপর নির্ভর করে ২০০০টাকা থেকে ৫০০০টাকা হতে পারে। ৩। দূরত্ব: সিলেট সদর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার। ৪। ভ্রমণের উপযুক্ত সময়: এপ্রিল-অক্টোবর পর্যন্ত সময়। ৫। হোটেল: ফেঞ্চুগঞ্জ জেলা পরিষদের ডাক বাংলোতে অবস্থান করতে পারেন। ফেঞ্চুগঞ্জ সারকাখানর আওতাধীন ভিআইপি সুবিধা সম্মিলিত রেস্ট হাউস রয়েছে।এছারা ভাল থাকার ব্যবস্থা উপজেলায় না খুঁজে সিলেট চলে এসে অবস্থান করতে পারেন।

রাজধানী ঢাকার কমলাপুর ও ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশন থেকে প্রতিদিন ৩টা ট্রেন ছাড়ে সিলেটের উদ্দেশ্যে। ট্রেনের ভাড়া প্রকার ভেদে ১২০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত। আর সময় লাগবে ৭-৮ ঘণ্টা। ট্রেনে গেলে রাত সাড়ে ৯টার উপবন এক্সপ্রেসে যাওয়াটাই সবচেয়ে ভালো। এছাড়া বাসেও যাওয়া যাবে। বাসে যেতে চাইলে অনেক বাস আছে। এর মধ্যে শ্যামলী, রূপসী বাংলা, হানিফ, সোহাগ, এনা,ইউনিক, উল্যেখযোগ্য। এছাড়াও আরো বিভিন্ন নামের একাধিক বাস রয়েছে, যেগুলো অপেক্ষাকৃত কম ভাড়ায় যাত্রী সেবা করে থাকে। ভোর থেকে শুরু করে রাত ১টা পর্যন্ত এসব বাস পাবেন। বাসে যেতে সময় লাগবে ৪ থেকে ৫ ঘন্টা। ননএসি ৩০০/৩৫০ টাকা। এসি ৯০০ টাকা পর্যন্ত।

আপনি যদি কুলাউড়া নেমে যান তবে ভাল। কুলাউড়া থেকে অটোরিক্সায় সরাসরি হাওরে চলে যেতে পারেন। অথবা সেখানে নেমে অটোরিক্সা নিয়ে অথবা বাসে চলে আসতে পারেন বড়লেখা। বড়লেখা গেলে আরো পাবেন মাধবকুন্ড জলপ্রপাত। অটোরিক্সার ভাড়া হবে জনপ্রতি ৫০ টাকা। বড়লেখা পৌঁছার পর শহর থেকে ১১ কি.মি দূরে হাকালকি হাওর এলাকা। যেখানে রয়েছে পর্যটন কেন্দ্র। রয়েছে ওয়াচ টাওয়ার ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। এই স্থান থেকে নৌকা ভাড়া নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারেন পুরো হাওর। আবার যদি সরাসরি ট্রেনে যেতে চান তবে কুলাউড়া স্টেশন অথবা ফেঞ্চুগঞ্জের মাইজগাঁও স্টেশন থেকে অটোরিক্সা করে হাকালুকি যেতে পারেন।

 

থাকা খাওয়া :

হাকালুকি হাওরে থাকার তেমন ভালো ব্যবস্থা নেই। এক্ষেত্রে পর্যটককে থাকতে হবে সিলেট শহরে। আর যাওয়ার সময় খাবার সঙ্গে করে নিয়ে গেলেই ভালো হয়। সিলেটে শহরে থাকার সুব্যবস্থা রয়েছে। সকল মানের হোটেলই রয়েছে এখানে।

 

 

0.00 avg. rating (0% score) - 0 votes
Tags
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close