খুলনা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি

দক্ষিণডিহি

বাংলাদেশের আরো হাজারো গ্রামের সাথে এই গ্রামটির তফাৎ বিশেষ নেই। অন্য সকল গ্রামের মতোই এই গ্রামও ভরে থাকে পাখিদের গুঞ্জনে, পথগুলিও আর সব গ্রামের অনুকরণে নির্জন ও ছায়াঘেরা। এ গ্রামেও আছে অবারিত ধানক্ষেত, সহজ সরল গ্রাম্য জীবন। মোটের উপর বলতে গেলে এই গ্রামটিকে গ্রামবাংলার আর সব গ্রামের ফটোকপি-ই বলা চলে। আগে থেকে জানা না থাকলে এই গ্রামের বিশেষ বিশেষত্বের কথা শুনে আপনাকে অবাক হতেই হবে।

যশোর ও খুলনা জেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ভৈরব নদের তীরে অবস্থিত এই গ্রামে- যার নাম “দক্ষিণডিহি”- কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি অবস্থিত। শুধু তাই নয়, এ গ্রামে ছিলো কবিগুরুর মামাবাড়িও। কবিগুরুর বাবা শ্রী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এ গ্রামের রামনারায়ণ রায়চৌধুরীর কন্যা সারদাসুন্দরী দেবীকে বিয়ে করেন। এবং শুধু তাই নয়, এটি কবিগুরুর বাবারও মামা-বাড়ির অঞ্চল। কারণ বিশ্বকবির পিতামহ প্রিন্স দ্বরকানাথ ঠাকুরের স্ত্রী দিগম্বরী দেবীও এই দক্ষিণডিহির মেয়ে।

আর তাই বলা চলে, কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর-বাড়ির সাথে এই গ্রামের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বিশ্বকবি এ গ্রামে এসেছেন কি-না, এমন প্রশ্ন রবীন্দ্র গবেষকদের প্রচেষ্টায় বর্তমানে অবান্তরের খাতায় নাম লিখিয়েছে। বিভিন্ন সুত্রে জানা যায় অন্তত তিনবার তিনি মামাবাড়িতে বেড়ানো এবং কণে দেখার কাজে এখানে পদধূলি দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে দক্ষিণডিহির বেণীমাধব রায়চৌধুরী এবং দাক্ষায়নী দেবীর মেয়ে ভবতারিণী দেবীর (বিয়ের পর ভবতারিণী দেবীর নাম রাখা হয় মৃণালিনী) বিয়ে হয় ১৮৮৩ সনের ৯ ডিসেম্বরে।

বিয়েটা কলকাতার জোড়াসাঁকোতে পারিবারিকভাবে হলেও এর আগেই দক্ষিণডিহিতে রবি ঠাকুর ও ভবতারিণী দেবীর দেখা হওয়া নিয়ে একটি মিষ্টি রোমান্টিক গাঁথা এ অঞ্চলের মানুষের মুখে শুনতে পাওয়া যায়। কবির মামাবাড়ি এবং শ্বশুরবাড়ির মাঝখানে “তিতির পুকুর” নামক একটি জলাশয় ছিলো। মামাবাড়িতে বেড়াতে আসা কিশোর কবি না কি কোনো এক সকালে এই পুকুরঘাটে ভবতারিনী দেবীকে দেখে মুগ্ধ হন এবং দু’লাইনের একটি কবিতা লেখেন।

কবিতাটি হচ্ছে– “মৃণালিনী ঘোমটা খোল, রবি তোমায় ডাকছে।” কবিগুরু ও মৃণালিনীর দেবীর ঘর আলো করে ছিলেন পাঁচ সন্তান- মাধুরীলতা, রথীন্দ্রনাথ, রেণুকা, মীরা এবং শমীন্দ্রনাথ। এঁদের মধ্যে খুব কম বয়সেই রেণুকা ও শমীন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়। মৃণালিনী দেবী ১৯০২ সালে মারা যান । রবীন্দ্র কমপ্লেক্সে টিকে থাকা মৃণালিনী দেবীর শৈশবকালীন আবাসস্থলটির মূল কাঠামোটি দো’তলা একটি ভবন বিশেষ। এই ভবনের সিঁড়ির দু’পাশে কবি এবং কবিপত্নীর দু’টি আবক্ষ ভাস্কর্য আছে।

আরো যা দেখতে করতে পারেনঃ

দক্ষিণডিহির মূল আকর্ষণ কবিগুরুর শ্বশুরবাড়ি যা বর্তমানে রবীন্দ্র কমপ্লেক্স নামে পরিচিত। কবির জন্মদিবস ও প্রয়ান দিবসে এখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও মেলার আয়োজন করা হয়। এসব অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দেশের পাশাপাশি বিশ্বের অন্য অনেক দেশ থেকেও রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের আগমন ঘটে। এছাড়াও গ্রামীণ জীবনের সরল পরিবেশ শহরবাসীকে মুগ্ধ করবে।

এ গ্রামের আরেকটি খ্যাতির কারণ হচ্ছে- পাঁপড়। বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানে দক্ষিণডিহি “পাঁপড়গ্রাম” নামেও পরিচিত। এ গ্রামের অনেক পরিবার পাঁপড় তৈরীর পেশায় জড়িত। চাইলে এদের কারো কাছ থেকে শিখে নিতে পারবেন উন্নত মানের পাঁপড় বানানোর কলা-কৌশল। চাইলে নৌকায় ঘুরে বেড়াতে পারবেন ভৈরবের বুকে। এ অঞ্চলে আছে ছোট-বড় অনেকগুলি নার্সারি। এই নার্সারিগুলিতে ঘুরে ঘুরে পরিচিত হতে পারবেন বাহারি সব প্রজাতির ফুল, ফল ও ঔষধি বৃক্ষের সাথে। দেখতে পারবেন পানের বরজ। আগ্রহী হলে নিতে পারবেন একদম টাটকা তাজা পানের স্বাদ। ভোজন রসিকরা বেজেরডাঙা বাজারে অবস্থিত “মুসলিম” হোটেলের বিভিন্ন রকমের সুস্বাদু তরকারীর স্বাদ নিতে ভুলবেন না

 

কীভাবে যাবেন :

ঢাকার গাবতলী এবং সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে প্রতি আধা ঘন্টা পরপর-ই বিভিন্ন কোম্পানির (যেমনঃ সোহাগ পরিবহণ, হানিফ পরিবহণ, ঈগল পরিবহণ, এ.কে. ট্রাভেলস ইত্যাদি) বাস খুলনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। বাসের ভাড়া মাথাপিছু ৩০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত। দক্ষিণডিহি ভ্রমণ করতে হলে আপনাকে নামতে হবে খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলার ফুলতলা বাজারে (এখান থেকে দক্ষিণডিহির দূরত্ব ৪ কিঃমিঃ) অথবা যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া বাজারে (এখান থেকে দক্ষিণডিহির দূরত্ব ৭ কিঃমিঃ)।

ফুলতলা বাজার বা নওয়াপাড়া বাজার থেকে ইজিবাইক ভাড়া করে খুব সহজেই দক্ষিণডিহি যাওয়া যায়। ইজিবাইক রিজার্ভ করলে ভাড়া পড়বে দূরত্বভেদে ২৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা। এছাড়া ফুলতলা বা নওয়াপাড়া থেকে বাসে করে গিয়ে বেজেরডাঙা বাজারে নেমে ভ্যান, রিক্সা বা ইজিবাইক নিয়েও রবীন্দ্র কমপ্লেক্সে পৌঁছানো যায়।

কোথায় থাকবেন:

থাকবার জন্য ফুলতলা এবং নওয়াপাড়া বাজারে বেশ কিছু ভালো মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে। যেখানে রুমভেদে ৩০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকার মধ্যে রাত্রিযাপন করা যাবে।

এছাড়াও আপনি খুলনা শহরে এসেও থাকতে পারবেন। খুলনা শহরে থাকার জন্য কিছু ভালো মানের হোটেলের ফোন নম্বরঃ

*হোটেল রয়েল ইন্টারন্যাশনাল-০১৯০-৮৫৬০১৩, ০১৭১৮-৬৭৯৯০০

*হোটেল টাইগার গার্ডেন-৮৮০৪১৭২১১০৮

*হোটেল ক্যাসল সালাম-০১৭১১-৩৯৭৬০৭, ৮৮০-৪১-৭৩০৭২৫

0.00 avg. rating (0% score) - 0 votes
Tags
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

Close
Close