রংপুর

ভিন্ন জগত

গুহার ভেতরে ঢুকেই শিশুদের চিৎকার। হইচই করতে করতে জড়িয়ে ধরছে মা-বাবা কিংবা ভাই-বোনদের। আনন্দের যেন শেষ নেই।

পার্কের চারদিকে একটি ট্রেন দুবার ঘুরে হ্রদের ধারে স্টেশনে এসে থামছে। যাত্রীরা নামছেন। হ্রদে স্পিডবোটে চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন অনেকে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে শিশুরা নাগরদোলায় দুলছে, নানা রাইডে চড়ছে।

রংপুর নগরের কোলাহলময় জীবন থেকে কিছুটা দূরে গঙ্গাচড়া উপজেলার খলেয়া গুঞ্জিপুর এলাকার নিরিবিলি পরিবেশে ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘ভিন্নজগত’ নামের বিনোদনকেন্দ্র। দিনভর আনন্দে ঘুরে বেড়াতে পারেন এখানে।

ছোট-বড় সবার জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা রাইড। রয়েছে মনীষীদের কথা ও লোকশিল্পের মেলা নামের ভিন্ন আয়োজন, শিশু কানন, মেরি-গো-রাউন্ড, সুইমিং পুল, হেলিকপ্টার, ফ্লায়িং জোন, নাগরদোলা, ক্যাঙ্গারু মুভিং, স্পাইডার জোন, এয়ারপ্লেন রাইড, আজব গুহা ইত্যাদি মজার সব আয়োজন। রাতে থাকার জন্য রয়েছে কটেজ। রান্নার আয়োজনও আছে। এ ছাড়া পুরো পার্কে রয়েছে পিকনিক স্পট। কেনাকাটার জন্য শপিং মলও আছে। খিদে পেয়ে গেলে বসে পড়ুন এখানকারই রেস্তোরাঁতে।

পার্কের ব্যবস্থাপক জিয়াউর রহমান বলেন, বিদ্যালয়ের শিশু-কিশোরদের জন্য বিভিন্ন রাইডে অর্ধেক টাকা ছাড় দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রতিবন্ধীদের জন্য বিনা মূল্যে সব রাইডে চড়ার সুবিধা রয়েছে। কম টাকায় গাড়ি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।

দেশী-বিদেশী শিল্পী, স্থপতি, প্রকৌশলী, শোভানুরাগী আর অগণিত শ্রমিকের টানা 5 বছরের নিরলস পরিশ্রমে রংপুর শহর থেকে একটু দূরে যান্ত্রিক ব্যসত্দতার বাইরে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের পাশে পাগলা পীরের উত্তরে গঞ্জিপুর এলাকায় গড়ে উঠেছে একটি সুপরিকল্পিত পর্যটন কেন্দ্র যার নাম ‘ভিন্নজগত’। সুবিশাল এলাকা তুলনাহীন প্রাকৃতিক এবং নেসর্গিক পরিবেশ। সমগ্র এলাকাজুড়ে রয়েছে বিভিন্ন প্রকার গোলাপ, ডালিয়া, চন্দ্রমলি্লকা, লিলি, রজনীগন্ধা, গ্লোবাল, কসমস, গাদা, সূর্যমুখী ইত্যাদি ফুলসহ আম, কাঁঠাল, লিচু, সুপারি, বিভিন্ন প্রকারের ঝাউগাছ, ইপিল ইপিল, মেহগনি, রাবার, পেয়ারার বাগান।

ক্যাকটাস, ওইপেং, ক্রিসমাসট্রি ঘন সবুজ ঘাসে ঘেরা বাগানের গাছের ডালে বসছে হাজারো পাখির মেলা। যা প্রকৃতিপ্রেমিক সৌন্দর্য পিপাসু পর্যটক ও পরিব্রাজকদের মনোরঞ্জন ও বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হতে পারে।

শিক্ষামূলক ভ্রমণে ‘ভিন্নজগত’ পর্যটন কেন্দ্র ছাত্রছাত্রী ও আনন্দ পিপাসুদের জন্য ভিন্ন মাত্রায় সজ্জিত। যার প্রমাণ ভিন্ন জগতে অবস্থিত দেশের একমাত্র ‘প্ল্যানেটরিয়াম’। এছাড়া গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় নির্মিত শপিংমল, 300 আসনবিশিষ্ট আধুনিক কনফারেন্স কেন্দ্র, কমিউনিটি সেন্টার, সুইমিংপুল ও মসজিদ।

‘শিশুদের জন্য হঁ্যা বলুন’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে শিশু-কিশোরদের আনন্দ দেওয়ার প্রয়াসে ভিন্ন জগতের নির্দিষ্ট সীমানায় সংযোজন করা হয়েছে_ শিশু কানন, মেরি গো রাউন্ড, হেলিকপ্টার ফ্লাইং জোন, নাগরদোলা, ক্যাঙ্গারু, বরফের দেশ, মুভিং মনোট্রেন, স্পাইডার জোন, বাম্পার কার, রেসিং হর্স, স্পেস জার্নি, বিশাল আকৃতির নিজস্ব লেকে নৌভ্রমণসহ সোয়ান ক্যাফে এবং শৌখিন মৎস্য শিকারিদের জন্য সুলভমূল্যে মৎস্য শিকারের ব্যবস্থা। সার্বক্ষণিক বৈদু্যতিক নিশ্চয়তা, ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার মাধ্যমে নিরাপত্তার ব্যবস্থা ও সারা বিশ্বের সঙ্গে টেলিযোগাযোগ এবং ইন্টারনেট সুবিধা।
ভিন্নজগত সম্পর্কিত কিছু তথ্য জানার জন্য কথা বলেছিলাম ভিন্ন জগৎ পর্যটন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান শাহ আলম চৌধুরীর সঙ্গে।

তিনি জানান, ভিন্নজগত পর্যটন কেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে সময় লাগবে। আমার ধারণা 22 বছর। অবশ্য কর্তব্যরত শিল্পীরা ধারণা করছেন 15/16 বছর, স্থপতিদের মতে 19/20 বছর। আরো এতো সময় লাগার কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, প্রতি দিন প্রতি মাসে ভিন্ন জগৎ সাজানো হবে নতুন রঙে এবং সংযোজন করা হবে নতুন কিছু। পরিবর্তন, পরিবর্ধন হতে থাকবে নতুন আদলে। তারপর জানতে চেয়েছিলাম আগামী পরিকল্পনার কথা, ভিন্নজগত পর্যটন কেন্দ্রের আগামী পরিকল্পনা রোবট স্কিল জোন, স্পেস জার্নি, জলতরঙ্গ, সি প্যারাডাইস, বিশ্বভ্রমণ, আজব গুহা ইত্যাদি।

সীমা লঙ্ঘনকারীকে আল্লাহ পছন্দ করেন না। তাই আমার স্বপ্নের সাজানো অঙ্গন ভিন্নজগতে ধমর্ীয় মূল্যবোধ বজায় রাখতে সকলের সহযোগিতা কামন করছি, একথা বললেন কতর্ৃপক্ষ।

ভিন্নজগত পর্যটন কেন্দ্রে প্রবেশ মূল্য : বাস-মিনিবাস-ট্রাক (যাত্রীসহ) 385 টাকা, মাইক্রোবাস-পিকআপ (যাত্রীসহ) 140 টাকা, কার-জিপ, টেক্সিক্যাব (যাত্রীসহ) 95 টকা, পায়ে হেঁটে (জনপ্রতি) 10 টাকা।

কীভাবে যাবেনঃ

ঢাকা থেকে রংপুরে বাস যোগে যেতে ঘন্টা ৬ সময় লাগবে। ঢাকা মহানগরের কল্যানপুর, মহাখালী থেকে রংপুর যাওয়ার বাস পাওয়া যাবে।মোটামুটি মানের বাস গুলোর ভাড়া ৩০০ থেকে ৭০০ পর্যন্ত। রংপুরের পাগলাপীর থেকে ভিন্ন জগতের ফটক পর্যন্ত ১৫ থেকে ২০ মিনিটের রাস্তা।

রংপুর শহরের মেডিকেল মোড় থেকে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও কিংবা পঞ্চগড়ের বাসে চড়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের পথ। পাগলাপীরে নামুন। এরপর এখান থেকে খলেয়া গুঞ্জিপুর বাজারে রিকশা কিংবা ভ্যানগাড়িতে যাওয়া যায়।

কোথায় থাকবেন :
পার্কের নিজস্ব ২৩টি কটেজ রয়েছে। ভিআইপি 2 হাজার টাকা, সাধারণ 1 হাজার থেকে 1 হাজার 500 টাকা, পিকনিকের জন্য কটেজ অগ্রিম বুকিং দেওয়া হয়।

এছাড়া রংপুর শহরে আবাসিক হোটেল রয়েছে।

সপ্তাহের প্রতি দিন সকাল 7টা থেকে সাড়ে 7টা পর্যন্ত পার্ক খোলা।

সত্যি হয়তো একদিন কোনো রক্ষণশীল পরিব্রাজক বলবেন, উদ্যোক্তার সাধ ছিল। পেরিয়ে যাবে আরো শতবর্ষ_ মনের অজানত্দেই কোনো ইউরোপীয় রুচিশীল পর্যটক তার প্রেমিকার হাত ধরে বলবে_ রংপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে সূর্যাসত্দের সময় যিনি ‘ভিন্নজগত’-এর সৌন্দর্য দেখেনি তিনি হয়তো কখনই বাংলার সৌন্দর্য দেখেননি।

0.00 avg. rating (0% score) - 0 votes
Tags
Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close